OPINION BASED

বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য: বিজয়া দশমীর পর কোজাগরী পূর্ণিমা ঘিরে বড়দের প্রণামের সেই রীতি কি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে?

By KASHINATH MANDAL • 2026-10-27 06:32 • 5 views   Share WhatsApp Share Facebook Share X
বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য: বিজয়া দশমীর পর কোজাগরী পূর্ণিমা ঘিরে বড়দের প্রণামের সেই রীতি কি আজ হারিয়ে যেতে বসেছে?

বিভাগ: বাংলার সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য

বাংলার সংস্কৃতি মানেই শুধু দুর্গাপুজো, লক্ষ্মীপুজো, মেলা কিংবা লোকউৎসব নয়। পারিবারিক সম্পর্ক, বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি শ্রদ্ধা, ছোটদের প্রতি স্নেহ এবং আত্মীয়তার বন্ধনও এই সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলার বহু পরিবারে উৎসবকে কেন্দ্র করে এই মূল্যবোধগুলির বিশেষ প্রকাশ দেখা যায়।

দুর্গাপুজোর আনন্দ শেষ হলে আসে বিজয়া দশমী। প্রতিমা বিসর্জনের পর অনেক পরিবারে শুরু হয় প্রণাম, আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর্ব। এরপর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ও শরৎপূর্ণিমাকে ঘিরেও কিছু পরিবারে আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার রীতি রয়েছে। বাড়ির বড়দের প্রণাম করা, তাঁদের আশীর্বাদ নেওয়া এবং পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নেওয়ার মাধ্যমে সম্পর্কের বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।

তবে সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রা ও যোগাযোগের ধরন বদলেছে। ব্যস্ততা, কর্মসূত্রে দূরে থাকা এবং ছোট পরিবারের সংখ্যা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলি অনেকের পক্ষে উৎসবের সময় আত্মীয়দের সঙ্গে সরাসরি দেখা করা কঠিন করে তুলতে পারে। অন্যদিকে, ফোন ও ভিডিও কলের মাধ্যমে দূরে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখা সম্ভব হচ্ছে।

বিজয়া দশমী: প্রণাম ও আশীর্বাদের মধ্য দিয়ে সম্পর্কের বন্ধন

বাঙালির কাছে বিজয়া দশমী শুধু দুর্গাপুজোর সমাপ্তি নয়, শুভেচ্ছা বিনিময় ও পারিবারিক মিলনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। বাংলার বহু পরিবারে এই দিনে ছোটরা বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করে এবং তাঁদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নেয়। সমবয়সীদের মধ্যে কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময়ের রীতিও প্রচলিত।

অনেক পরিবারে বিজয়ার শুভেচ্ছা একটি দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে গিয়ে দেখা করা, মিষ্টিমুখ করা এবং পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য পরবর্তী কয়েক দিনও বেছে নেওয়া হয়। বিশেষ করে যেখানে আত্মীয়রা একই গ্রাম বা কাছাকাছি এলাকায় বসবাস করেন, সেখানে এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে যাওয়ার রীতি এখনও দেখা যায়।

এই ধরনের পারিবারিক যোগাযোগের মধ্য দিয়ে ছোটরা বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা, আত্মীয়তার সম্পর্কের যত্ন নেওয়া এবং উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মতো মূল্যবোধের সঙ্গে পরিচিত হয়।

কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ও আত্মীয়তার টান

শরতের নির্মল আকাশ, শিউলি ফুলের গন্ধ, কাশফুলের দোলা এবং পূর্ণিমার চাঁদ কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর আবহকে বিশেষ করে তোলে। দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার পাশাপাশি কিছু পরিবারে এই সময় আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে দেখা করার রীতিও রয়েছে। কেউ বাবা-মায়ের বাড়িতে যান, কেউ কাকা-কাকিমা বা মামা-মামির সঙ্গে দেখা করেন, আবার কেউ পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেন।

তবে এই রীতি বাংলার প্রতিটি পরিবারে একইভাবে প্রচলিত নয়। অঞ্চল, পারিবারিক অভ্যাস ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী এর মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। যেসব পরিবারে এই প্রথা রয়েছে, সেখানে আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করা ভালোবাসা প্রকাশ, খোঁজখবর নেওয়া এবং পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখার একটি সুযোগ।

বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম: শ্রদ্ধা প্রকাশের একটি প্রচলিত রীতি

বাংলার পারিবারিক সংস্কৃতিতে বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রণাম করার বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। এর মাধ্যমে ছোটরা বড়দের প্রতি সম্মান প্রকাশ করে এবং বড়রা আশীর্বাদ ও স্নেহের মাধ্যমে সেই সম্পর্কের উত্তর দেন। পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর ফলে তাঁদের অভিজ্ঞতা শোনা, পুরনো দিনের গল্প জানা এবং পরিবারের ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়।

প্রণাম করার পদ্ধতি পরিবারভেদে আলাদা হতে পারে। কেউ পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেন, কেউ হাত জোড় করে নমস্কার জানান। শ্রদ্ধা প্রকাশের ধরন ভিন্ন হলেও বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রতি সম্মান, যত্ন ও সৌজন্য বজায় রাখাই এর মূল কথা।

কেন আত্মীয়দের বাড়িতে যাওয়ার অভ্যাস বদলাচ্ছে?

সময়ের সঙ্গে সমাজ ও মানুষের জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এসেছে। তার প্রভাব পারিবারিক সম্পর্ক বজায় রাখার পদ্ধতিতেও পড়েছে। কয়েকটি বিষয় এই পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

১. কর্মব্যস্ততা ও সময়ের অভাব: চাকরি, ব্যবসা, পড়াশোনা ও অন্যান্য দায়িত্বের কারণে অনেকের পক্ষে পুজোর ছুটির পর আত্মীয়দের বাড়িতে গিয়ে দেখা করার জন্য আলাদা সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে।

২. ভৌগোলিক দূরত্ব: কাজ ও পড়াশোনার কারণে পরিবারের সদস্যরা এখন বিভিন্ন শহর, রাজ্য কিংবা দেশের বাইরে বসবাস করেন। ফলে উৎসবের সময় সরাসরি দেখা করা সব সময় সম্ভব হয় না।

৩. পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন: যৌথ পরিবারের পরিবর্তে ছোট পরিবারে বসবাসের ফলে কিছু ক্ষেত্রে একসঙ্গে একাধিক প্রজন্মের থাকার সুযোগ কমেছে। এর ফলে কিছু পারিবারিক রীতির চর্চাও আগের তুলনায় বদলে যেতে পারে।

৪. যোগাযোগের মাধ্যমের পরিবর্তন: মোবাইল ফোন, ভিডিও কল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সাহায্যে এখন সহজেই শুভেচ্ছা জানানো যায়। দূরে থাকা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেও এই মাধ্যমগুলি কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

৫. পারিবারিক রীতির ধারাবাহিকতা: পরিবারের পুরনো রীতিগুলির তাৎপর্য নতুন প্রজন্মকে বোঝানো না হলে কিছু অভ্যাস সময়ের সঙ্গে হারিয়ে যেতে পারে। তবে সব পরিবারে একই পরিবর্তন ঘটেছে, এমন দাবি করা যায় না। বাংলার বহু পরিবারে এখনও বিজয়ার প্রণাম, আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করা এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের আশীর্বাদ নেওয়ার রীতি গুরুত্বের সঙ্গে পালিত হয়।

ফোনে শুভেচ্ছা, নাকি সরাসরি দেখা—কোনটির গুরুত্ব বেশি?

প্রযুক্তি দূরে থাকা আত্মীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা সহজ করেছে। ফোনকল বা ভিডিও কলের মাধ্যমে বাবা-মায়ের খোঁজ নেওয়া, বড়দের প্রণাম জানানো এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করা যায়। যাঁদের পক্ষে দূরত্ব বা অন্য কারণে বাড়িতে যাওয়া সম্ভব নয়, তাঁদের জন্য এই মাধ্যমগুলি বিশেষভাবে উপযোগী।

তবুও সরাসরি দেখা করার মধ্যে আলাদা আন্তরিকতা রয়েছে। বড়দের সামনে বসে কথা বলা, তাঁদের অভিজ্ঞতা শোনা, একসঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়া কিংবা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর নিজস্ব আনন্দ রয়েছে। তাই ফোনে শুভেচ্ছা জানানোকে ছোট করে দেখার প্রয়োজন নেই। একই সঙ্গে সুযোগ থাকলে সরাসরি দেখা করার চেষ্টাও পারিবারিক সম্পর্ককে আরও আন্তরিক করে তুলতে পারে।

নতুন প্রজন্মের কাছে ঐতিহ্যের মূল্য তুলে ধরা

ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য শুধু অতীতের কথা বলাই যথেষ্ট নয়; দৈনন্দিন জীবনেও শ্রদ্ধা ও সম্পর্কের চর্চা থাকা জরুরি। বিজয়া দশমী থেকে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর সময়ের মধ্যে সুবিধামতো এক দিন আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করা যেতে পারে। পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাঁদের শরীর-স্বাস্থ্যের খোঁজ নেওয়া এবং তাঁদের অভিজ্ঞতার কথা শোনার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।

শিশুদের বোঝানো যেতে পারে যে প্রণাম কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং শ্রদ্ধা ও সৌজন্য প্রকাশের একটি প্রচলিত উপায়। পরিবারের প্রবীণদের কাছ থেকে তাঁদের ছোটবেলার পুজোর স্মৃতি ও পুরনো দিনের গল্প শুনলে নতুন প্রজন্মও পারিবারিক ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পায়। দূরে থাকা আত্মীয়দের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখাও এই সম্পর্ক বজায় রাখতে সাহায্য করে।

ঐতিহ্য মানে পুরনো সবকিছু হুবহু ফিরিয়ে আনা নয়

সমাজ পরিবর্তিত হয় এবং মানুষের জীবনযাত্রাও বদলায়। তাই অতীতের প্রতিটি অভ্যাসকে আগের মতো ফিরিয়ে আনা সব সময় সম্ভব নয়। তবে পুরনো রীতির মধ্যে থাকা ভালো মূল্যবোধগুলি ধরে রাখা সম্ভব। আত্মীয়দের খোঁজ নেওয়া, বয়োজ্যেষ্ঠদের সম্মান করা, তাঁদের প্রয়োজনে পাশে থাকা এবং পরিবারের ছোটদের স্নেহ করা—এই মূল্যবোধগুলি কোনও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

ঐতিহ্য রক্ষার অর্থ শুধু একটি পুরনো রীতি পালন করা নয়; বরং সেই রীতির মধ্যে থাকা মানবিক শিক্ষা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

উপসংহার: উৎসব শেষ হলেও সম্পর্কের বন্ধন অটুট থাকুক

বিজয়া দশমীর প্রণাম, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর পূর্ণিমা এবং আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে গিয়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের আশীর্বাদ নেওয়ার স্মৃতি বাংলার বহু পরিবারের কাছে আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। সময়ের পরিবর্তনে কিছু পরিবারের রীতিতে বদল আসতে পারে। ব্যস্ততা, দূরত্ব ও আধুনিক জীবনযাত্রা সেই পরিবর্তনের সম্ভাব্য কারণ। তবে বড়দের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখার গুরুত্ব আজও রয়েছে।

আগের মতো প্রতিটি বাড়িতে যাওয়া সম্ভব না হলেও সুযোগমতো পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের সঙ্গে দেখা করা, তাঁদের কথা শোনা এবং তাঁদের পাশে থাকার চেষ্টা করা যায়। কারণ, উৎসবের আনন্দ কয়েক দিনের হলেও পরিবারের মানুষের ভালোবাসা, আশীর্বাদ ও আন্তরিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের সম্পদ। বাংলার সংস্কৃতি শুধু পুজোর আয়োজন কিংবা উৎসবের আলোয় নয়, মানুষের আচরণে, পারস্পরিক শ্রদ্ধায় এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে যাওয়া মূল্যবোধেও বেঁচে থাকে।

##Latestupdate
KASHINATH MANDAL 2 followers