HEALTH

GRAM BANGLA HEALTH GUIDE পায়ে ঝিনঝিনি, দাঁড়াতে পারছেন না? দ্রুত বাড়ছে হাত-পায়ের দুর্বলতা—বিপজ্জনক হতে পারে বিরল স্নায়ুরোগ GBS

By KASHINATH MANDAL • 2026-10-30 09:45 • 5 views   Share WhatsApp Share Facebook Share X
GRAM BANGLA HEALTH GUIDE  পায়ে ঝিনঝিনি, দাঁড়াতে পারছেন না? দ্রুত বাড়ছে হাত-পায়ের দুর্বলতা—বিপজ্জনক হতে পারে বিরল স্নায়ুরোগ GBS

পায়ে ঝিনঝিনি, হাঁটতে অসুবিধা? দ্রুত বাড়তে থাকা দুর্বলতা হতে পারে GBS-এর লক্ষণ

বিশেষ স্বাস্থ্য প্রতিবেদন | ২৯ অক্টোবর ২০২৬

প্রথমে পায়ে ঝিনঝিনি, তারপর হাঁটতে অসুবিধা, সিঁড়ি ভাঙতে কষ্ট কিংবা হাত-পায়ের শক্তি কমে যাওয়া—এই উপসর্গগুলি কখনও গুরুতর স্নায়বিক সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে দুর্বলতা বাড়তে পারে। গুরুতর অবস্থায় শ্বাস নেওয়া, কথা বলা কিংবা খাবার গিলতেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এই ধরনের দ্রুত বাড়তে থাকা উপসর্গের একটি সম্ভাব্য কারণ হলো Guillain–Barré Syndrome (GBS)। এটি একটি বিরল স্নায়বিক রোগ, যেখানে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুল করে peripheral nervous system-এর স্নায়ুকে আক্রমণ করে। গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাসপ্রশ্বাসসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ কাজ ব্যাহত হতে পারে। তাই সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসকের মূল্যায়ন জরুরি।

Guillain–Barré Syndrome বা GBS কী?

আমাদের স্নায়ুতন্ত্র মস্তিষ্ক থেকে শরীরের বিভিন্ন অংশে সংকেত পৌঁছে দেয়। এর মাধ্যমে আমরা হাঁটি, হাত নাড়াই, স্পর্শ অনুভব করি এবং পেশির নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণ করি। GBS-এ স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে পেশির দুর্বলতা, হাত-পায়ে অস্বাভাবিক অনুভূতি এবং কখনও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ পেশিগুলির কাজেও সমস্যা দেখা দিতে পারে।

এই রোগ যেকোনও বয়সে হতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের কয়েক সপ্তাহের মধ্যে GBS দেখা যায়। তবে সব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।

GBS-এর প্রাথমিক লক্ষণ কী কী?

১. পায়ে ঝিনঝিনি বা অবশ ভাব

পায়ের আঙুল, পায়ের পাতা কিংবা হাতের আঙুলে ঝিনঝিনি, অবশ ভাব বা অস্বাভাবিক অনুভূতি দেখা দিতে পারে। কখনও স্নায়ুজনিত ব্যথাও হতে পারে।

২. পেশির শক্তি কমে যাওয়া

হাঁটতে, সিঁড়ি ভাঙতে, চেয়ার থেকে উঠতে বা স্বাভাবিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে অসুবিধা হতে পারে। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে দুর্বলতা পা থেকে শুরু হয়ে শরীরের ওপরের দিকে ছড়ায়।

৩. হাত-পায়ের দুর্বলতা দ্রুত বাড়া

দুর্বলতা কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে বাড়তে পারে। হাত দুর্বল হয়ে গেলে জিনিস ধরা বা দৈনন্দিন কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

৪. মুখের পেশিতে সমস্যা

কিছু রোগীর মুখের পেশি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। হাসতে, চোখ বন্ধ করতে বা স্পষ্টভাবে কথা বলতে অসুবিধা হতে পারে।

৫. গিলতে বা শ্বাস নিতে অসুবিধা

গুরুতর ক্ষেত্রে খাবার গিলতে, কথা বলতে বা শ্বাস নিতে সমস্যা হতে পারে। এগুলি জরুরি অবস্থার লক্ষণ এবং অবিলম্বে চিকিৎসা প্রয়োজন।

বিশেষ সতর্কতা: পায়ে ঝিনঝিনি হলেই GBS হয়েছে, এমন নয়। কিন্তু ঝিনঝিনির সঙ্গে দ্রুত বাড়তে থাকা দুর্বলতা, হাঁটতে না পারা বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে অপেক্ষা করবেন না।

কেন GBS হয়?

GBS-এর সঠিক কারণ সব ক্ষেত্রে জানা যায় না। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে এর আগে ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ হয়ে থাকতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে পেটের সংক্রমণ বা ডায়রিয়ার পরেও রোগটি দেখা যায়।

  • সংক্রমণের পর দুর্বলতা হলেই GBS হয়েছে, এমন নয়।
  • GBS ছোঁয়াচে রোগ নয়।
  • শুধু উপসর্গ দেখে বাড়িতে রোগ নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
  • দুর্বলতা দ্রুত বাড়তে থাকলে পরীক্ষা সম্পূর্ণ হওয়ার অপেক্ষায় জরুরি চিকিৎসা বিলম্বিত করা উচিত নয়।

কীভাবে GBS নির্ণয় করা হয়?

GBS নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসক রোগীর উপসর্গের ইতিহাস, পেশির শক্তি, স্নায়ুর প্রতিক্রিয়া এবং দুর্বলতা কত দ্রুত বাড়ছে তা মূল্যায়ন করেন। প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি পরীক্ষা করা হতে পারে।

  • Neurological Examination: পেশির শক্তি, অনুভূতি এবং স্নায়ুর reflex পরীক্ষা করা হয়।
  • Nerve Conduction Study ও EMG: স্নায়ু ও পেশির মধ্যে বৈদ্যুতিক সংকেত চলাচল মূল্যায়ন করতে সাহায্য করে।
  • Lumbar Puncture: প্রয়োজন হলে মেরুদণ্ডের চারপাশের তরলের নমুনা পরীক্ষা করা হয়।
  • অন্যান্য পরীক্ষা: বিকল্প কোনও রোগের সম্ভাবনা যাচাই করতে রক্ত পরীক্ষা বা অন্য পরীক্ষা করা হতে পারে। শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশি কতটা কাজ করছে, সেটিও চিকিৎসক পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।

সব রোগীর সব পরীক্ষা লাগে না। রোগীর অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন। GBS-এর সন্দেহ হলে জরুরি পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা শুরু করতে অযথা দেরি করা উচিত নয়।

GBS-এর চিকিৎসা কী?

GBS-এর সন্দেহ হলে সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি করে পর্যবেক্ষণ করা হয়। কারণ দুর্বলতা বাড়লে শ্বাসপ্রশ্বাস, হৃদ্‌স্পন্দন এবং রক্তচাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক কার্যকলাপ প্রভাবিত হতে পারে।

১. Intravenous Immunoglobulin (IVIG)

IVIG হলো শিরার মাধ্যমে দেওয়া একটি বিশেষ ধরনের immunoglobulin চিকিৎসা। রোগীর অবস্থা ও চিকিৎসকের মূল্যায়ন অনুযায়ী এটি ব্যবহার করা হয়।

২. Plasma Exchange

এই পদ্ধতিতে রক্তের প্লাজমা আলাদা করে প্রক্রিয়াজাত করার মাধ্যমে ক্ষতিকর প্রতিরোধী উপাদান সরানোর চেষ্টা করা হয়। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে এটি GBS-এর একটি স্বীকৃত চিকিৎসা-পদ্ধতি।

IVIG ও plasma exchange-এর মধ্যে কোনটি উপযুক্ত, তা রোগীর অবস্থা, রোগের পর্যায় এবং হাসপাতালের চিকিৎসা-পরিকল্পনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।

৩. শ্বাসপ্রশ্বাসের সহায়তা

শ্বাস নেওয়ার পেশি দুর্বল হলে ICU-তে পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে ventilator-এর সাহায্য লাগতে পারে। এই কারণেই গুরুতর GBS-এ দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ।

৪. Physiotherapy ও পুনর্বাসন

রোগের তীব্র পর্যায় কাটার পরে পেশির শক্তি, হাঁটার ক্ষমতা ও দৈনন্দিন কাজের সক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপি এবং পুনর্বাসন সহায়ক হতে পারে। অনেক রোগী উল্লেখযোগ্যভাবে সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন দুর্বলতা, ব্যথা বা ক্লান্তি থেকে যেতে পারে।

মনে রাখবেন: GBS-এর চিকিৎসা বাড়িতে নিজে থেকে করা নিরাপদ নয়। দ্রুত বাড়তে থাকা দুর্বলতা থাকলে হাসপাতালে মূল্যায়ন করানোই অগ্রাধিকার।

কখন এক মুহূর্তও অপেক্ষা করবেন না?

নিচের লক্ষণগুলির কোনওটি দেখা দিলে জরুরি বিভাগে যান বা জরুরি অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা নিন:

  • কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের মধ্যে হাত-পায়ের দুর্বলতা বাড়তে থাকা।
  • হাঁটতে বা দাঁড়াতে না পারা।
  • শ্বাস নিতে অসুবিধা।
  • খাবার বা জল গিলতে অসুবিধা।
  • কথা বলতে বা মুখের পেশি নাড়াতে সমস্যা।
  • দুর্বলতার সঙ্গে দ্রুত শারীরিক অবস্থার অবনতি।

শ্বাসকষ্ট বা গিলতে অসুবিধা শুরু হওয়ার অপেক্ষা করবেন না। গুরুতর উপসর্গ থাকলে দূরের বিশেষজ্ঞের অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য অপেক্ষা না করে নিকটতম উপযুক্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।

বড় হাসপাতাল ও চিকিৎসা পরিষেবা: AIIMS, New Delhi

All India Institute of Medical Sciences (AIIMS), New Delhi-তে বিভিন্ন স্নায়বিক সমস্যার মূল্যায়ন ও চিকিৎসার পরিষেবা রয়েছে। GBS-এর মতো গুরুতর স্নায়বিক সমস্যার মূল্যায়নের জন্য Department of Neurology প্রাসঙ্গিক। তবে নির্দিষ্ট রোগীর জন্য কোন পরিষেবা, পরীক্ষা বা শয্যা পাওয়া যাবে, তা হাসপাতালের বর্তমান ব্যবস্থা ও রোগীর অবস্থার ওপর নির্ভর করে।

ঠিকানা: AIIMS, Ansari Nagar, New Delhi – 110029.

গুরুত্বপূর্ণ: AIIMS-এর যোগাযোগের নম্বর, OPD বুকিংয়ের সময়সূচি এবং জরুরি পরিষেবার তথ্য প্রকাশের আগে হাসপাতালের বর্তমান সরকারি তথ্য থেকে যাচাই করুন। ফোন নম্বর বা সময়সূচি পরিবর্তিত হতে পারে। জরুরি উপসর্গ থাকলে OPD অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য অপেক্ষা করবেন না।

রোগীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগে কী করবেন?

  1. দুর্বলতা কখন শুরু হয়েছে এবং কত দ্রুত বাড়ছে, তা চিকিৎসককে জানান।
  2. আগের প্রেসক্রিপশন, পরীক্ষার রিপোর্ট এবং ব্যবহৃত ওষুধের তালিকা সঙ্গে রাখুন।
  3. রোগীর শ্বাস নিতে বা গিলতে অসুবিধা হলে OPD বুকিংয়ের অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করুন।
  4. হাসপাতালে যাওয়ার আগে বর্তমান OPD, রেফারেল এবং রোগী দেখানোর নিয়ম যাচাই করুন, যদি তা করতে গিয়ে জরুরি চিকিৎসায় দেরি না হয়।
  5. রোগীকে দূরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে গিয়ে জরুরি চিকিৎসা বিলম্বিত করবেন না।

গ্রামবাংলার মানুষের জন্য বিশেষ বার্তা

গ্রামাঞ্চলে হাত-পায়ে দুর্বলতা বা ঝিনঝিনিকে অনেক সময় সাধারণ দুর্বলতা, অপুষ্টি বা অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফল বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু দুর্বলতা দ্রুত বাড়তে থাকলে অপেক্ষা করা বিপজ্জনক হতে পারে।

প্রথমে কাছের উপযুক্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান। সেখানে প্রয়োজনীয় মূল্যায়নের পর বড় বিশেষায়িত হাসপাতালে রেফার করার ব্যবস্থা হতে পারে। রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস বা গিলতে সমস্যা থাকলে দ্রুত চিকিৎসা পাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা

Guillain–Barré Syndrome বিরল, কিন্তু এর লক্ষণ দ্রুত গুরুতর হতে পারে। সময়মতো হাসপাতালে ভর্তি, শ্বাসপ্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ, উপযুক্ত চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

  • দ্রুত বাড়তে থাকা হাত-পায়ের দুর্বলতা অবহেলা করবেন না।
  • শ্বাসকষ্ট বা গিলতে অসুবিধা হলে জরুরি চিকিৎসা নিন।
  • নিজে থেকে ওষুধ বা ঘরোয়া চিকিৎসা শুরু করবেন না।
  • গুরুতর উপসর্গ থাকলে দূরের হাসপাতালের অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য অপেক্ষা করবেন না।

স্বাস্থ্য-সতর্কতা: এই প্রতিবেদন সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি। এটি ব্যক্তিগত রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।

##latestupdate
KASHINATH MANDAL 2 followers