মানবসেবার এক অনন্য প্রতীক মাদার টেরেজা—মৃত্যুদিনে বিশ্বজুড়ে স্মরণ, শ্রদ্ধায়
৫ সেপ্টেম্বর | বিশেষ প্রতিবেদন
মানুষের ধর্ম, জাতি, ভাষা কিংবা পরিচয় নয়—মানুষের কষ্টকেই নিজের কাজের কেন্দ্র করে নিয়েছিলেন তিনি। অসুস্থ, দরিদ্র, অনাথ ও সমাজের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন মাদার টেরেজা। তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করছে গ্রাম বাংলা রিপোর্ট নিউজ চ্যানেল।
কেন আজও মাদার টেরেজাকে স্মরণ করা হয়?
মাদার টেরেজার জন্ম ১৯১০ সালের ২৬ আগস্ট (তৎকালীন অটোমান সাম্রাজ্যের স্কোপিয়ে; বর্তমানে উত্তর মেসিডোনিয়া)। অল্প বয়সেই তিনি ধর্মীয় জীবন বেছে নেন এবং পরবর্তীতে ভারতে এসে মানবসেবাকে তাঁর জীবনের প্রধান লক্ষ্য করে তোলেন।
কলকাতায় এসে তিনি দরিদ্র ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজ শুরু করেন। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন Missionaries of Charity—যে সংগঠন পরবর্তীকালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবসেবামূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়।
তাঁর কাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল সমাজের সেই মানুষগুলির কাছে পৌঁছনো, যাঁরা অসুস্থতা, দারিদ্র্য বা সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে অন্যদের কাছ থেকে সাহায্য পাচ্ছিলেন না।
কলকাতার সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক
মাদার টেরেজার জীবনের সঙ্গে কলকাতার নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। শহরের দরিদ্র মানুষের জন্য তাঁর কাজ তাঁকে আন্তর্জাতিক পরিচিতি এনে দেয়।
কলকাতার Mother House দীর্ঘদিন ধরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত Missionaries of Charity-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। মৃত্যুর পর তাঁর সমাধিও সেখানেই রয়েছে।
নোবেল শান্তি পুরস্কার থেকে ভারতরত্ন
মানবসেবার স্বীকৃতি হিসেবে মাদার টেরেজা ১৯৭৯ সালে Nobel Peace Prize লাভ করেন। পুরস্কার গ্রহণের সময়ও তিনি দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কথা সামনে আনেন।
ভারত সরকার তাঁকে ১৯৮০ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ভারতরত্ন প্রদান করে।
তাঁর জীবনে আরও বহু আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সম্মান এসেছিল। তবে তাঁর নিজের কাছে মানুষের পাশে দাঁড়ানোই ছিল সবচেয়ে বড় কাজ।
৫ সেপ্টেম্বর ১৯৯৭—শেষ হলো এক অধ্যায়
১৯৯৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর, কলকাতায় মাদার টেরেজার মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৭ বছর।
তাঁর মৃত্যুর পর ভারত সরকার রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর শেষকৃত্যের ব্যবস্থা করে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ কলকাতায় এসে তাঁকে শেষ শ্রদ্ধা জানায়।
পরবর্তীকালে ক্যাথলিক চার্চ তাঁকে সন্ত হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ২০১৬ সালে পোপ ফ্রান্সিস তাঁকে Saint Teresa of Calcutta হিসেবে ঘোষণা করেন।
তাঁর উত্তরাধিকার আজও বহমান
মাদার টেরেজার মৃত্যুর সঙ্গে তাঁর কাজ থেমে যায়নি। Missionaries of Charity-এর সন্ন্যাসিনীরা এখনও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দরিদ্র, অসুস্থ, অনাথ ও অসহায় মানুষের জন্য কাজ করে চলেছেন।
তবে তাঁর জীবন নিয়ে যেমন গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে, তেমনই তাঁর কাজের পদ্ধতি ও কিছু বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক ও সমালোচনাও হয়েছে। একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ও বিতর্ক—দুই দিকই তথ্যভিত্তিকভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
মাদার টেরেজার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা কী?
মাদার টেরেজার জীবন আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—সমাজের সবচেয়ে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দায়িত্ব কি শুধু সরকারের, নাকি প্রত্যেক মানুষেরও?
তাঁর কর্মজীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা ছিল মানুষের দুঃখকে উপেক্ষা না করা। বড় পরিবর্তন সবসময় বড় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আসে না—অনেক সময় একজন মানুষের ছোট উদ্যোগও অন্যের জীবনে বড় আশার কারণ হয়ে উঠতে পারে।