STORY

আবাদা স্টেশনের ‘পাগল বাছা’: ভূতের গল্প, নাকি হারিয়ে যাওয়া এক মানুষের স্মৃতি?

By ABHIGAYAN RITH • 2026-08-22 07:02 • 3 views   Share WhatsApp Share Facebook Share X
আবাদা স্টেশনের ‘পাগল বাছা’: ভূতের গল্প, নাকি হারিয়ে যাওয়া এক মানুষের স্মৃতি?

রাত নামলেই বদলে যায় স্টেশনের পরিবেশ? স্থানীয়দের মুখে মুখে ঘোরা রহস্যময় কাহিনির অনুসন্ধানে উঠে এল একাধিক প্রশ্ন

আবাদা, পশ্চিমবঙ্গ | অভিজ্ঞান রীত


কিছু কিছু জায়গায় পৌঁছলে মনে হয়, জায়গাটিই যেন মানুষকে দেখছে। দিনের আলোয় যে স্থানটি একেবারেই সাধারণ, রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে সেই জায়গার পরিবেশই যেন বদলে যায়। আবাদা স্টেশনও কি তেমনই?

ছোট্ট একটি রেলস্টেশন। দু-একটি প্ল্যাটফর্ম, পুরনো স্টেশন বিল্ডিং, টিকিট কাউন্টার, কয়েকটি গাছ এবং তার পাশ দিয়ে চলে যাওয়া রেললাইন। দিনের ব্যস্ত সময়ে দেখলে অস্বাভাবিক কিছুই চোখে পড়ে না। কিন্তু সন্ধ্যার পর স্টেশন ফাঁকা হতে শুরু করলেই স্থানীয়দের মুখে উঠে আসে একটি নাম—**‘পাগল বাছা’**।

কে ছিলেন এই পাগল বাছা? সত্যিই কি এমন কোনও ব্যক্তি এই স্টেশনের আশেপাশে ঘুরে বেড়াতেন? নাকি বছরের পর বছর মানুষের মুখে মুখে ঘুরতে ঘুরতে একটি সাধারণ ঘটনাই পরিণত হয়েছে অতিপ্রাকৃত এক লোককথায়?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয়েছিল অনুসন্ধান।


## স্থানীয়দের মুখে একই গল্প

স্টেশনের আশেপাশের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে একটি বিষয় সামনে আসে। তাঁদের বর্ণনায়, ‘পাগল বাছা’ নামে এক ব্যক্তি একসময় স্টেশনের আশেপাশে ঘোরাফেরা করতেন।

কেউ দাবি করেন, তাঁর নাম ছিল বাছা। আবার কেউ বলেন, ‘বাছা’ তাঁর আসল নাম নাও হতে পারে।

স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়, কখনও তাঁকে প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে, কখনও রেললাইনের ধারে, আবার কখনও স্টেশন বিল্ডিংয়ের আশেপাশে দেখা যেত। তাঁর আচরণও নাকি সবসময় একরকম ছিল না।

কখনও তিনি দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ বসে থাকতেন। কখনও কোনও নির্দিষ্ট দিকে তাকিয়ে থাকতেন। আবার কখনও শেষ ট্রেন চলে যাওয়ার পরেও স্টেশন এলাকায় থেকে যেতেন বলে দাবি স্থানীয়দের একাংশের।

তবে এই দাবিগুলির পক্ষে কোনও নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি, ঐতিহাসিক রেকর্ড বা স্পষ্ট আলোকচিত্রের সন্ধান মেলেনি।

ফলে ‘পাগল বাছা’ সম্পর্কে যে তথ্য পাওয়া যায়, তার বড় অংশই নির্ভর করছে মৌখিক ইতিহাস এবং স্থানীয় স্মৃতির উপর।


## রাতের আবাদা স্টেশন

দিনের আলোয় স্টেশনটি সাধারণ হলেও রাতের পরিবেশ অনেকটাই আলাদা। পুরনো স্টেশনের তুলনামূলক কম আলো, ফাঁকা প্ল্যাটফর্ম এবং দূরে চলে যাওয়া রেললাইন—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক ধরনের নিস্তব্ধতা।

এক অনুসন্ধানকারীর অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, রাতে স্টেশনের শেষ প্রান্তের একটি পুরনো কংক্রিটের বেঞ্চ তাঁর নজরে আসে। স্থানীয়দের বর্ণনায় এই জায়গাটির সঙ্গেও ‘পাগল বাছা’র গল্প জড়িয়ে রয়েছে।

তবে এখানেও প্রশ্ন থেকে যায়—এই বেঞ্চ বা জায়গাটির সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ কি রয়েছে?

উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়।


## রহস্যময় শব্দ—নাকি স্বাভাবিক শব্দ?

রাতের অনুসন্ধানের সময় রেললাইনের পাশ থেকে শোনা যায় একটি শব্দ—‘টক... টক... টক...’।

প্রথমে সেটিকে মানুষের হাঁটার শব্দ বলে মনে হলেও পরে অন্য সম্ভাবনাও উঠে আসে। কোনও প্রাণী, রেললাইনের ধাতব অংশের স্বাভাবিক শব্দ কিংবা আশেপাশের অন্য কোনও উৎস থেকেও এমন শব্দ তৈরি হতে পারে।

অর্থাৎ শুধুমাত্র শব্দ শোনার ভিত্তিতে অতিপ্রাকৃত কোনও ঘটনার দাবি করা যায় না।

পরবর্তীতে একটি অডিও রেকর্ডিংয়ে অস্পষ্ট নিম্ন-কম্পাঙ্কের একটি শব্দ শোনা যায় বলেও দাবি করা হয়। সেটি মানুষের কণ্ঠস্বরের মতো মনে হলেও স্পষ্ট কোনও শব্দ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিতে এমন ক্ষেত্রে **auditory pareidolia**-র সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না—অর্থাৎ অস্পষ্ট বা এলোমেলো শব্দের মধ্যে মানুষের মস্তিষ্ক পরিচিত শব্দ বা কণ্ঠস্বর খুঁজে নিতে পারে।


## অন্ধকারে ছায়া, নাকি মানুষ?

আরও একটি ঘটনা এই গল্পকে রহস্যময় করে তোলে।

স্টেশনের শেষ প্রান্তে দূর থেকে একটি মানুষের মতো অবয়ব দেখা গিয়েছিল বলে দাবি করা হয়। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখা যায়, সেটি কোনও মানুষ নয়—বাতাসে নড়তে থাকা একটি পুরনো কাপড়।

ঘটনাটি দেখায়, অন্ধকার ও কম আলোতে মানুষের মস্তিষ্ক কত সহজেই অসম্পূর্ণ কোনও আকৃতিকে পরিচিত কোনও রূপ হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে।

ফলে রাতের স্টেশনে দেখা প্রতিটি ছায়াকেই অতিপ্রাকৃত ঘটনার প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ।


## দেওয়ালে ‘বাছা’ লেখা?

অনুসন্ধানের আরেক পর্যায়ে স্টেশনের একটি পুরনো দেওয়ালে অস্পষ্ট কিছু লেখা চোখে পড়ে। তার মধ্যে ‘বাছা’ শব্দটি রয়েছে বলে মনে হয়েছিল।

তবে লেখাটি এতটাই মুছে গিয়েছিল যে নিশ্চিতভাবে শব্দটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

এখানেও একই প্রশ্ন—সত্যিই কি সেখানে ‘বাছা’ লেখা ছিল, নাকি কম আলো ও পূর্বপরিচিত গল্পের প্রভাবেই মস্তিষ্ক একটি অস্পষ্ট লেখাকে পরিচিত শব্দ হিসেবে গ্রহণ করেছিল?

নিশ্চিত উত্তর নেই।


## ভূতের গল্প, নাকি একজন মানুষের গল্প?

আবাদা স্টেশনের ‘পাগল বাছা’ কাহিনির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক সম্ভবত এখানেই।

হয়তো সত্যিই একসময় এমন একজন মানুষ ছিলেন, যিনি স্টেশনের আশেপাশে ঘোরাফেরা করতেন। হয়তো তাঁর মানসিক সমস্যা ছিল। হয়তো তাঁর জীবনে কোনও দুর্ঘটনা ঘটেছিল। হয়তো তাঁর মৃত্যু ঘিরে কোনও ঘটনা ঘটেছিল।

কিন্তু সেই ঘটনার নির্ভরযোগ্য নথি না থাকায় পরবর্তী প্রজন্মের স্মৃতি, ভয় এবং কল্পনা ধীরে ধীরে তার সঙ্গে মিশে গিয়ে একটি নতুন কিংবদন্তির জন্ম দিয়েছে—এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

মৌখিক ইতিহাসের ক্ষেত্রেও এমন ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। একজনের বলা ঘটনা পরবর্তী সময়ে আরেকজনের বর্ণনায় কিছুটা বদলে যেতে পারে। বছরের পর বছর ধরে সেই গল্পে নতুন অভিজ্ঞতা যুক্ত হতে পারে। একসময় বাস্তব ঘটনা এবং লোককথার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে যায়।

‘পাগল বাছা’র গল্পের ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে।


## প্রমাণ কোথায়?

এই অনুসন্ধানে এখনও পর্যন্ত এমন কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি, যা আবাদা স্টেশনে অতিপ্রাকৃত কোনও উপস্থিতির দাবি নিশ্চিত করতে পারে।

কোনও স্পষ্ট ছবি নেই। কোনও যাচাইযোগ্য সরকারি রেকর্ড নেই। কোনও পরিষ্কার অডিও প্রমাণ নেই।

রয়েছে মানুষের অভিজ্ঞতা, স্থানীয় স্মৃতি এবং বহু বছর ধরে প্রচলিত একটি গল্প।

আর সেখানেই হয়তো এই কাহিনির আসল আকর্ষণ।

কারণ মানুষ যখন কোনও জায়গাকে একটি গল্পের সঙ্গে জুড়ে দেয়, তখন জায়গাটিও ধীরে ধীরে সেই গল্পের অংশ হয়ে ওঠে।

আবাদা স্টেশনের ক্ষেত্রেও হয়তো তাই হয়েছে।


## শেষ ট্রেনের পর

আজও যদি গভীর রাতে আবাদা স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ফাঁকা হয়ে যায়, শেষ ট্রেনটি চলে যায় এবং চারপাশে নেমে আসে নিস্তব্ধতা—তাহলে হয়তো বিশেষ কিছুই ঘটবে না।

হয়তো দূরে কোনও আলো দেখা যাবে। কোনও কুকুর ডাকবে। বাতাসে কোনও পাতা নড়বে। রেললাইনের ধাতব অংশ থেকে কোনও অচেনা শব্দ আসবে।

আর অন্ধকারে কোনও ছায়াকে হয়তো কয়েক সেকেন্ডের জন্য মানুষ বলে মনে হতে পারে।

কিন্তু তার পরেও একটি প্রশ্ন থেকে যাবে—

‘পাগল বাছা’ আসলে কে ছিলেন?

তিনি কি সত্যিই একজন মানুষ, যাঁর স্মৃতি সময়ের সঙ্গে হারিয়ে গিয়ে ভূতের গল্পে পরিণত হয়েছে?

নাকি তিনি শুধুই একটি লোককথার চরিত্র?

নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন।

তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—আবাদা স্টেশনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এই কাহিনি এখনও মানুষের কৌতূহল জাগায়।

একটি নাম হয়ে।

একটি স্মৃতি হয়ে।

একটি অসম্পূর্ণ গল্প হয়ে।

‘পাগল বাছা’ হয়ে।

#Horror story#Mystery
ABHIGAYAN RITH 0 followers