সৌদি আরবের পর পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে দ্বিতীয় জনবহুল দেশ হলো সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে দেশটির ১১ মিলিয়নের (এক কোটি ১০ লাখ) বেশি জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশই বিদেশি। বিদেশিদের একটি বড় অংশ এসেছে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে।
দেশটিতে প্রায় ২০০টি ভিন্ন জাতিসত্তার মানুষ রয়েছে, যাদের বেশিরভাগই কাজের জন্য এসেছে। এদের মধ্যে ভারতীয়রাই দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী আমিরাতি নাগরিকত্বধারীর সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ ১০ হাজার। পুরো দেশে পুরুষের হার ৬৩ দশমিক ৮ শতাংশ এবং নারীর হার ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ। পরিবারের সঙ্গে আসতে না পারা বিপুল সংখ্যক অভিবাসী শ্রমিকের উপস্থিতির কারণেই এই ভারসাম্যহীনতা দেখা গেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অর্থনীতির আকার ও প্রবৃদ্ধির পরিমাপক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) হিসেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের জিডিপি প্রায় ৫০৪ বিলিয়ন ডলার। মাথাপিছু জিডিপি বা ক্রয়ক্ষমতা সমতা হিসেবে এটি প্রায় ৫৩ হাজার ডলার।
আমিরাতের অর্থনীতি মূলত তেলের ওপর নির্ভরশীল। দেশের জিডিপির প্রায় ৩০ শতাংশ এবং সরকারি রাজস্বের ৪১ শতাংশ আসে তেল থেকে। দৈনিক অপরিশোধিত তেল উৎপাদন ৩ কোটি ৮৩ লাখ ব্যারেল এবং প্রমাণিত তেল মজুতের পরিমাণ আনুমানিক ১১৩ বিলিয়ন ব্যারেল।
আব্রাহাম চুক্তি
সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, মরক্কো ও সুদান ২০২০ সালে ‘আব্রাহাম চুক্তি’ সই করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেয়।
আমিরাতের পক্ষ থেকে বলা হয়, এই উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল “ইসরায়েলের পশ্চিম তীর দখল ঠেকানো এবং ফিলিস্তিনি ও ইসরায়েলের মধ্যে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান রক্ষা করা”।
২০২২ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরদার হয়। তেলবহির্ভূত বাণিজ্য ২০২০ সালের ১৬০ মিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৩ সালে বেড়ে ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। এই বাণিজ্যের মধ্যে মূল্যবান পাথর, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম ও গাড়ি অন্তর্ভুক্ত ছিল।
গাজা যুদ্ধের সময়, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর দক্ষিণ ইসরায়েলে হামাসের হামলাকে সংযুক্ত আরব আমিরাত “একটি বিপজ্জনক উত্তেজনা” হিসেবে উল্লেখ করে নিন্দা জানায় এবং “অবিলম্বে ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতির” আহ্বান জানায়।
একই সময়ে, ইসরায়েলের সঙ্গে আমিরাতের বাণিজ্যও অব্যাহত থাকে এবং ২০২৩ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তা প্রায় ১১ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক
২০১৭ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সৌদি আরব, বাহরাইন ও মিসরের সঙ্গে মিলে সংযুক্ত আরব আমিরাত কাতারের ওপর অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞায় অংশ নেয়। ওই দেশগুলো কাতারের বিরুদ্ধে “সন্ত্রাসবাদে সমর্থন ও অর্থায়ন” এবং “ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক” থাকার অভিযোগ তোলে। কাতার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল।
ইরানের নিয়ন্ত্রণাধীন তিনটি দ্বীপ—আবু মুসা, গ্রেটার তুনব ও লেসার তুনব—নিজেদের সার্বভৌম ভূখণ্ড বলে দাবি করে আমিরাত।
হরমুজ প্রণালির কাছে অবস্থিত হওয়ায় এসব দ্বীপ কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-চতুর্থাংশ সামুদ্রিক তেল বাণিজ্য, পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস ও রাসায়নিক সার পরিবাহিত হয়।
তবে বাস্তবে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্য যেকোনো আরব দেশের তুলনায় ইরানের সঙ্গে আমিরাতের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেশি বলে বিভিন্ন বাণিজ্যিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়। ইরানের শুল্ক প্রশাসনের ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, চীনের পর ইরানের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত।
২০২০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে দুই দেশের বাণিজ্য ১১ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
২০১৬ সালে তেহরানে সৌদি দূতাবাসে হামলার পর সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে আমিরাতও কূটনৈতিক সম্পর্ক সীমিত করে।
তবে ২০১৯ সালের পর থেকে দুই দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আবার উন্নতির দিকে যেতে শুরু করে। ২০২৩ সালে সৌদি আরবও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনরায় শুরু করে।